দেশের কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হলে অটোমেশন, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও আনুষ্ঠানিক অর্থায়নে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। অথচ বর্তমানে এ খাতে ঋণ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ২৮০ কোটি ডলার বা ৩৪ হাজার কোটি টাকা, যা উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশেষ করে নারী মালিকানাধীন ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোগগুলোর ৬৫ শতাংশই এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। এ প্রেক্ষাপটে অটোমেশন ছাড়া সিএমএসএমই খাতের সম্প্রসারণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল ১২তম জাতীয় এসএমই পণ্যমেলার দ্বিতীয় দিনে ‘স্বয়ংক্রিয় উদ্ভাবনের মাধ্যমে সিএমএসএমইর অগ্রযাত্রাকে রূপদান’ শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য উঠে আসে। এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মুসফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক শাহ জিয়া-উল হক। এ সময় তিনি বলেন, ‘সিএমএসএমই খাতের বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জামানত ও সম্পদের অভাব। এ খাতের পক্ষে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ অত্যন্ত কম। পর্যাপ্ত অর্থ ও অনলাইনে নিজেদের উপস্থিতি বা ছাপ তৈরির সুযোগও সীমিত। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ও অর্থ-সংক্রান্ত জ্ঞানের মধ্যে একটি স্পষ্ট ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে।’
শাহ জিয়া-উল হক জানান, সিএমএসএমই খাতে সঠিক ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে দেশে ১ লাখ কোটি ডলারের ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। বর্তমানে এ খাতের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশ। এ বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দেশের প্রযুক্তি-সচেতন তরুণ জনগোষ্ঠী প্রস্তুত রয়েছে।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সিএমএসএমই খাতের গুরুত্ব অপরিসীম উল্লেখ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর যখন আমাদের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারের হবে, তখন এ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো কর্মপ্রবাহ সরবরাহ বা ওয়ার্কফ্লো সাপ্লাইয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ অবদান রাখবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সিএমএসএমই খাত সম্পূর্ণ অটোমেশন না হওয়া পর্যন্ত আমরা অনেক সুবিধা পুরোপুরি পাব না। এ কাজটি কেবল সরকার একা করবে না; শিল্পোদ্যোক্তা, একাডেমিশিয়ান, সরকার ও উন্নয়ন অংশীদার—সবাইকে এক সারিতে থাকতে হবে।’
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং সিএমএসএমই খাতের মধ্যে সম্পর্ক প্রসঙ্গে শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি উন্নত হলে সিএমএসএমই খাত আরো ভালোভাবে এগোবে। আর সিএমএসএমই খাত উন্নত হলে তথ্যপ্রযুক্তির কদর আরো বাড়বে।’
বাংলাদেশে প্রায় দেড় দশক আগে থেকে অটোমেশনের কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অটোমেশনের জন্য বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে কাজ করা জরুরি, যার মধ্যে আইনগত বা নিয়ন্ত্রক কাঠামো হলো প্রথম। এটি চিহ্নিত করা জরুরি যে, আমরা কোথায় আছি ও কোথায় যেতে চাই। কারণ এর মাধ্যমে ঘাটতিগুলো বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়।’
সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবু সাঈদ, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খোরশেদ আনোয়ার, বিজনেস অটোমেশন লিমিটেডের পরিচালক শোয়েব আহমেদ মাসুদ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা আকবর। সেশন পরিচালনায় ছিলেন এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজিম হাসান সাত্তার।